পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করছে সীমান্তভেদী মরণনেশা ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল ও হেরোইন। এই মাদক প্রবাহকে কেবল অবৈধ চোরাচালান বা নিছক অর্থনৈতিক ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আপাতদৃষ্টিতে একে বিপুল অর্থের একটি অবৈধ ‘ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক’ মনে হলেও, এর গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে প্রশ্ন ওঠে—এই মাদকপ্রবাহ কি বাংলাদেশের যুবসমাজকে পঙ্গু, অকর্মণ্য ও দিশেহারা করে একটি জাতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়ার কোনো সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ?
একটি জাতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। এই যুবসমাজকে যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া যায়, তবে সেই দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, অর্থনীতি ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পেরিয়ে আসা ইয়াবা ও আইস কিংবা ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে আসা ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক এ দেশের তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক একে ‘আফিম যুদ্ধ’ বা ‘ওপিয়াম ওয়ার’-এর আধুনিক সংস্করণের সঙ্গে তুলনা করেন, যার মূল লক্ষ্য যুদ্ধ ছাড়াই একটি সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল ও অচল করে দেওয়া।
বাংলাদেশের মোট আয়তন নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময়ের পর বাংলাদেশের ভূখণ্ডের পরিমাণে পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশের স্থলসীমান্তের বড় একটি অংশ ভারতের সঙ্গে এবং একটি অংশ মিয়ানমারের সঙ্গে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে প্রায় ২৭১ কিলোমিটার। এছাড়া বাংলাদেশের রয়েছে দীর্ঘ উপকূলীয় সীমারেখা।
এই দীর্ঘ সীমান্তের কারণে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু অপরাধী চক্র মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের যুবসমাজকে মাদকাসক্ত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। মাদক পাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।
মাদকপ্রবাহ বন্ধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। তাই মাদক প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে মাদক পাচার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়া আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
মাদকের ভূ-রাজনীতি এবং গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ও ক্রিসেন্ট
বাংলাদেশের মাদক সমস্যার গভীরতা বুঝতে হলে বিশ্ব মাদক মানচিত্রে এর ভৌগোলিক অবস্থান বা জিও-পলিটিক্স বোঝা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিশ্বের দুটি ঐতিহাসিক মাদক উৎপাদন অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত। একটি হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’—মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী অঞ্চল। অন্যটি দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’—আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরানকে ঘিরে গড়ে ওঠা মাদক উৎপাদন অঞ্চল।
বিশেষ করে মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে আফিম ও মেথামফেটামিনসহ বিভিন্ন অবৈধ মাদক উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অন্যতম দেশ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত বাংলাদেশের জন্য মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ নিজে বড় ধরনের মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান নেটওয়ার্কের ঝুঁকিতে রয়েছে।
মিয়ানমারের ইয়াবা ও আইসের বিস্তার
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে মাদকের অনুপ্রবেশকে শুধু সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সংঘটিত সাধারণ চোরাচালান হিসেবে দেখলে সমস্যাটির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ মাদক উৎপাদন ও পাচারকে উৎসাহিত করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত করা সমীচীন নয়। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইয়াবা ও আইসের বিস্তার একটি গুরুতর সামাজিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। মাদকাসক্তি তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পারিবারিক জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের সীমান্ত ও ফেনসিডিল-হেরোইন চোরাচালান
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক বাংলাদেশে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে।
প্রশ্ন হলো, সীমান্তে এত কঠোর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বিপুল পরিমাণ মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে? এ ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী অপরাধী চক্র, দুর্নীতি, দুর্গম ভৌগোলিক এলাকা এবং দুই দেশের মধ্যে মাদক চোরাচালানবিরোধী সমন্বয়ের ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মাদক পাচারকে কোনো একটি দেশের রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। তবে মাদক উৎপাদন ও পাচারের উৎস বন্ধে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কার্যকর সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
যুবসমাজের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক আঘাত
মাদকের বিষাক্ত ছোবল বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। মাদকাসক্তির কারণে অপরাধপ্রবণতা, পারিবারিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
একজন মাদকাসক্ত তরুণ শুধু নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; তার পরিবারও দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যে পড়ে। পারিবারিক সঞ্চয় চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়, নষ্ট হয় সামাজিক ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা।
মাদকাসক্তি একজন তরুণের শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মাদক প্রতিরোধকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি সামাজিক ও জাতীয় উন্নয়ন ইস্যু হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি
বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এই স্বপ্নের মূল ভিত্তি যদি কর্মক্ষম যুবসমাজ হয়, তাহলে মাদকাসক্তির বিস্তার সেই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। মাদকাসক্তির কারণে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে পারে, কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেতে পারে এবং স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়তে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও মাদক চোরাচালান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে যে বিপুল অবৈধ অর্থ তৈরি হয়, তা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধী চক্রের যোগসূত্র তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও মাদক পাচার, মানবপাচার ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়েও বিভিন্ন সময় অভিযোগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে মাদকের প্রবাহ একটি গুরুতর সীমান্ত, সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা। এটিকে শুধু অবৈধ ব্যবসা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, সীমান্তবর্তী অপরাধী চক্র এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বুলেট বা কামানের পাশাপাশি একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়ার বিভিন্ন উপায় থাকতে পারে। মাদকাসক্তির বিস্তারও একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি স্তরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
যুবসমাজকে রক্ষা করার অর্থই হলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা। এই লড়াইয়ে সফল হতে হলে মাদকের উৎস, পাচারপথ ও অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক—তিন ক্ষেত্রেই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক:
এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী
কলামিস্ট ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব
মহাসচিব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি
চেয়ারম্যান, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার

