বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষি খাতের সম্পর্ক সরাসরি। আর কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সার। ফলে সরকারি ভর্তুকিযুক্ত সার দেশের কৃষকের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে পাচার হলে তা কৃষক ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারে পাচারের সময় ইউরিয়া ও অন্যান্য সার জব্দের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। জুলাইয়ে উখিয়া সীমান্তে ১৩ বস্তা ইউরিয়া সারসহ চারজনকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়। আবার জুলাইয়ের শেষ দিকে উখিয়ায় মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়ার সময় ছয় বস্তা ইউরিয়া সারসহ একজনকে আটক করে বিজিবি। আগস্টেও টেকনাফের নাফ নদীতে মিয়ানমারে পাচারের প্রাক্কালে ৫৩ বস্তা সার ও একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা জব্দের তথ্য পাওয়া যায়।
এসব ঘটনা সীমান্ত এলাকায় সার পাচারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। লেখকের মতে, সরকারি ভর্তুকির সুবিধা নিয়ে কোনো অসাধু চক্র যদি সার মজুদ করে সীমান্তপথে পাচার করে, তাহলে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির সুফল দেশের বাইরে চলে যায়।
কৃষকের সার যেন সীমান্তে না যায়
সরকার কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে বিভিন্ন ধরনের সারে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো কৃষক যেন প্রয়োজনের সময় সাশ্রয়ী মূল্যে সার পান এবং সময়মতো চাষাবাদ করতে পারেন।
কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে অনিয়ম হলে তার প্রভাব সরাসরি কৃষকের ওপর পড়ে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় সার পাচারের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত চক্রকে শনাক্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যায়ে শুধু বাহক বা ছোটখাটো পাচারকারীকে আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পাচারের উৎস, সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অর্থের লেনদেনের সঙ্গে কারা জড়িত—সেগুলোও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর দাবি
নাফ নদী, সীমান্তবর্তী খাল এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকার কারণে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও রাডার ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সারের গুদাম, ডিলার পর্যায় এবং সীমান্তমুখী পরিবহন ব্যবস্থায় কার্যকর মনিটরিং চালু করা জরুরি।
সার পাচারের সঙ্গে মাদক প্রবেশের অভিযোগ
সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য পাচার এবং বিপরীতে মাদকসহ অবৈধ পণ্য প্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিছু প্রতিবেদনে সার ও অন্যান্য পণ্যের বিনিময়ে মাদক আসার অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন।
যদি কোনো চক্র সার পাচারের অর্থনৈতিক লাভকে ব্যবহার করে মাদক চোরাচালানেও জড়িত থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।
প্রয়োজন সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা
সার পাচার বন্ধে কয়েকটি পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে। কারখানা বা আমদানি পর্যায় থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ডিলারদের মজুদ, বিক্রয় ও পরিবহন নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।
কোনো ডিলার বা ব্যবসায়ী অবৈধভাবে সার মজুদ, কালোবাজারি কিংবা পাচারের সঙ্গে জড়িত প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি সীমান্তে বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে।
কৃষক দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত ভর্তুকিযুক্ত সার কোনোভাবেই পাচারকারীদের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। তাই মিয়ানমারমুখী সার পাচারের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িত প্রকৃত চক্রকে আইনের আওতায় আনা এবং কৃষকের কাছে সারের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
লেখক: মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব, সিনিয়র সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার।

