এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী
একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সুদৃঢ় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইন অমান্য করার প্রবণতা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও সামাজিক সহিংসতার নানা ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ।
আমার দৃষ্টিতে, এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করা। তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের ঘাটতি স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারে এবং সামাজিক বিরোধ ও অপরাধ মোকাবিলায় স্থানীয় নেতৃত্বের কার্যকর ভূমিকা সীমিত করতে পারে।
নেতৃত্বের শূন্যতা ও স্থানীয় বাস্তবতা
দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। কোথাও জনপ্রতিনিধিরা অনুপস্থিত, কোথাও তাদের কার্যক্রম সীমিত। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব ও জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তবে স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে জনপ্রতিনিধিদের অভিজ্ঞতা ও জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। স্থানীয় মানুষের সমস্যা, বিরোধ, সামাজিক উত্তেজনা কিংবা সম্ভাব্য সংঘাত সম্পর্কে জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনকে দ্রুত অবহিত করতে পারেন।
কেন দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রয়োজন?
১. নেতৃত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের ঘাটতি থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব তৈরি হতে পারে। নির্বাচন হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে স্থানীয় জনগণের জবাবদিহিতা দাবি করার সুযোগ তৈরি হবে।
২. জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণ মানুষকে তাদের এলাকার নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি জবাবদিহিতার কাঠামো তৈরি হতে পারে।
৩. আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় সহযোগিতা
অপরাধ দমনে স্থানীয় তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্থানীয় সমস্যাগুলো সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পেতে পারে।
৪. স্থানীয় বিরোধ দ্রুত সমাধান
ছোটখাটো সামাজিক বিরোধ সময়মতো সমাধান না হলে তা বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। আইনসঙ্গত সালিশি ও মধ্যস্থতার সুযোগ থাকলে অনেক বিরোধ প্রাথমিক পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে কোনো সালিশই আইনের বিকল্প হতে পারে না; গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে।
জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হলে নতুন জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব শুধু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ এবং স্থানীয় বিরোধ নিরসনে ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবে।
গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।
নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দীর্ঘায়িত হলে জনপ্রতিনিধিত্বের ঘাটতি আরও দীর্ঘ হতে পারে। প্রশাসক দিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মতো জনগণের সরাসরি রাজনৈতিক জবাবদিহিতা সেখানে থাকে না।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়াকে দায়ী করলে বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। অপরাধ দমন, পুলিশি সক্ষমতা, বিচারিক প্রক্রিয়া, বেকারত্ব, মাদক, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক পরিবেশসহ নানা বিষয় আইনশৃঙ্খলার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বৃহত্তর সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের একটি অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত
শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই হবে না; নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য। ভোটাররা যেন ভয় বা চাপ ছাড়া ভোট দিতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
নির্বাচন কমিশনকে আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রার্থী ও ভোটার—সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপসংহার
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পুলিশের তৎপরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন কার্যকর স্থানীয় শাসনব্যবস্থা, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব।
আমার মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপের মাধ্যমে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা প্রয়োজন। তবে সেই নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতামূলক শাসন যত শক্তিশালী হবে, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও তত কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
লেখক: মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব, সিনিয়র সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি এবং চেয়ারম্যান, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার।

